দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় দেড় বছর পর মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসেও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অপরিপক্কতার অভিযোগ উঠেছে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে। নির্বাচনের আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি। ঠিক এমন সময়ে মাঠ প্রশাসনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বদলি করে আবার তা বাতিল এবং একই সঙ্গে ১১৮ জন কর্মকর্তার পদোন্নতি—সব মিলিয়ে সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাবেক আমলাদের মতে, এসব সিদ্ধান্ত প্রশাসনের ভাবমূর্তি ও নির্বাচনি পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সে হিসাবে সরকারের হাতে সময় আছে ১৫ দিনেরও কম। এমন প্রেক্ষাপটে চলতি মাসে ৮ উপজেলার ইউএনও বদলি করে দুদিনের মাথায় সেই আদেশ বাতিলের ঘটনা ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়। ভোটের একেবারে কাছাকাছি সময়ে মাঠ প্রশাসনে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে অনেকেই অনভিপ্রেত বলে মনে করছেন।
ইউএনও বদলি ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা
গত ২০ জানুয়ারি ভোলার চরফ্যাশন, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর, ফরিদপুরের নগরকান্দা, পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া, বগুড়ার ধুনট, হবিগঞ্জের বাহুবল, নেত্রকোনার কমলাকান্দা ও বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার ইউএনওদের বদলি করে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনের সম্মতির ভিত্তিতে এ রদবদল করা হয়েছে। বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের ২২ জানুয়ারির মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এমনকি, যোগদান না করলে ওই দিন বিকেলে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত হিসেবে গণ্য করার কথাও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ ছিল।
তবে ২২ জানুয়ারি আরেকটি প্রজ্ঞাপনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানায়, ২০ জানুয়ারির বদলির আদেশ বাতিল করা হয়েছে।
জানা যায়, একটি রাজনৈতিক দলের আপত্তির পর নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় প্রথমে বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও ভোট সামনে রেখে মাঠ প্রশাসনে অসন্তোষ তৈরি হয়। একই সঙ্গে আরেকটি রাজনৈতিক দলও এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে সরকার শেষ পর্যন্ত আদেশ বাতিল করতে বাধ্য হয়।
ইউএনও বদলি করে আবার তা বাতিলের ঘটনায় প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে করছেন সাবেক আমলারা।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া ইউএনবিকে বলেন, ‘এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও গভীরভাবে ভাবা উচিত ছিল। বদলি করে আবার বাতিল করা কোনো ভালো দৃষ্টান্ত নয়। এতে মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি হয়—কেন বদলি করা হলো, আবার কেনই-বা বাতিল করা হলো।’
তিনি বলেন, এর প্রভাব কিছুটা হলেও নির্বাচনি পরিবেশে পড়তে পারে। ‘এক পক্ষ বলবে অভিযোগের ভিত্তিতে বদলি হয়েছিল, পরে আপস করে বাতিল করা হয়েছে—এমন ধারণা জনমনে জন্ম নেওয়াটাই স্বাভাবিক।’
একই মত সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারের। তিনি বলেন, ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধন ভালো হলেও এ সময়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে আবার তা বাতিল হওয়া উচিত ছিল না। এতে প্রশাসনে একটি গ্যাপ তৈরি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তবে তিনি এও বলেন, বদলির আদেশ বাতিল করার মধ্য দিয়ে সরকার হয়তো নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে, যা ইতিবাচক হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
বিতর্কের মধ্যেই ১১৮ কর্মকর্তার পদোন্নতি
ইউএনও বদলি–বাতিলের বিতর্কের মধ্যেই নির্বাচন সামনে রেখে মঙ্গলবার ১১৮ জন যুগ্ম সচিবকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেয় সরকার।
পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বস্তি থাকলেও সাবেক আমলাদের একটি অংশ এটিকে ভালো চোখে দেখছেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক সচিব বলেন, ‘ভোট যখন একেবারে সামনে, তখন সরকারের এ ধরনের বড় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়। অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। এ পদোন্নতি ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হলে সরকার অস্বস্তিতে পড়তে পারে।’
এ বিষয়ে সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, নিরপেক্ষভাবে যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি হলে সেটি দোষের কিছু নয়। তবে কোনো উদ্দেশ্য বা চাপের কারণে পদোন্নতি দেওয়া হলে তা সব সময়ই প্রশাসনের জন্য ক্ষতিকর।
শুরু থেকেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নতুন সরকার গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আগের সরকারের আস্থাভাজন অনেক কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেয়। কাউকে চাকরি থেকে বিদায়, কাউকে ওএসডি, আবার কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে ফেরানো হয়। এসব সিদ্ধান্ত ঘিরেও তখন ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়।
সাবেক আমলারা বলছেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ত্রুটি ও বিলম্বের কারণে প্রশাসনে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যোগ্য কর্মকর্তারা বঞ্চিত হয়েছেন, আবার বিতর্কিত কর্মকর্তারা ভালো পদায়ন পেয়েছেন—এমন অভিযোগও উঠেছে। এর জেরে সচিবালয়ে নজিরবিহীন বিক্ষোভ পর্যন্ত হয়েছে। ডিসি পদে বড় আকারের রদবদল যতবারই করা হয়েছে, ততবারই বিতর্ক তৈরি হয়েছে; যদিও পরে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকার সিদ্ধান্ত সংশোধনের চেষ্টা করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান প্রশাসন পুরো সময়জুড়েই দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছে। তবে এসব সিদ্ধান্তের পেছনে খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না বলেই তারা মনে করেন। রাজনৈতিক চাপ, কর্মকর্তাদের অনৈতিক আন্দোলন এবং বাস্তবতা সামাল দেওয়ার অক্ষমতার কারণে সরকারকে অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে আবার সরে আসতে হয়েছে বলে দাবি তাদের।
সরকারের ব্যাখ্যা
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. এহছানুল হক বলেন, চাপের মুখে নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতেই যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
ইউএনও বদলির পর আদেশ বাতিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চলতি মাসে কিছু ইউএনও বদলি করার পর আবার সেই আদেশ বাতিলের ঘটনায় তিনি ‘খারাপ কিছু’ দেখছেন না।